গোপালগঞ্জে অলৌকিক ঘটনায় তোলপাড়

সারাদেশ

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের জিকাবাড়ী গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ঠারুণতলা পুকুর। সেখানে রাস্তার পাশে একটি গাছ আছে। এ গাছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পূজা-অর্চনা করে।

ঠারুণতলা পুকুরপারের মাটির নিচ থেকে অলৌকিকভাবে লাল রক্ত বের হচ্ছে বলে দাবি করছে এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকজন। প্রতিদিন শত শত উত্সুক মানুষ ওই স্থানটি দেখতে ভিড় করছে। এটি অলৌকিক, নাকি লৌকিক—এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। প্রতিদিনই উত্সুক দর্শনার্থীর ভিড় বাড়ছে।

অলৌকিক এ ঘটনা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ওই পুকুর ও রাস্তায় ধূপ-মোমবাতি জ্বালিয়ে ও ঢাক-ঢোল বাজিয়ে পূজা করছে। একটি ঝিকাগাছে লাল-সাদা শাড়ি পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, ওই স্থানে দেবী বিরাজ করছেন। তাই এখানে পাইলিং করে রাস্তা নির্মাণ করায় তাঁর গা ছিদ্র হয়ে রক্ত বের হচ্ছে।

এ স্থান নিয়ে অনেক আগে থেকেই নানা ধরনের অলৌকিক কল্পকাহিনি শোনা যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর তৎকালীন চেয়ারম্যান ঠারুণতলা পুকুরের পার দিয়ে ডোমরাকান্দি-গোয়ালগ্রাম রাস্তাটি নির্মাণ করেন। দীর্ঘ ১৪ কিলোমিটার রাস্তার কোথাও কিছু না হলেও ঠারুণতলায় এলাকার ৪০-৪৫ ফুট রাস্তা ভেঙে দেবে যায়। সেখানে এ পর্যন্ত যতবার মাটি দেওয়া হয়েছে, ততবারই ফাটল ধরে দেবে গেছে।

জিকাবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা গোবিন্দ কির্তনীয়া, প্রমথ বিশ্বাস, চিত্তরঞ্জন বিশ্বাস, বিভূতি বিশ্বাসসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাস্তাটি তৈরির পর থেকে দেবে যাওয়া অংশ ১৫-১৬ বার মাটি ভরাট করে ঠিক করা হয়েছে। কিছুদিন ভালো থাকার পর দেবে গিয়ে এর চারপাশ ভেঙে যায়। কোনোভাবেই ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। এত মাটি কোথায় যায়, তাও বোঝা যাচ্ছে না। সম্প্রতি সরকারিভাবে রাস্তাটি পাকা করার কাজ শুরু করলে ওই স্থানটি আবারও দেবে যায়। তখন ঠিকাদার ভাঙা স্থানে পাইলিং করে মাটি ও বালু দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কাজ শুরু হলে ১০ ফুট নিচে যাওয়ার পর আর সেখানে পাইলিং যায়নি। পরে দেখা যায়, ওই স্থানের প্রায় ১০০ ফুট জায়গা নিয়ে ফাটল ধরেছে। সেসব ফাটল দিয়ে কখনো লাল, কখনো বা গোলাপি রঙের পানি বের হচ্ছে। তখন মিস্ত্রিরা পাইলিংয়ের কাজ বন্ধ করে দেয়।

ওই গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ চিত্তরঞ্জন বিশ্বাস (৭২) বলেন, ‘পাকিস্তান আমল থেকে ওই স্থানে বুড়োমার পূজা শুরু হয়। সেই সময় মায়ের সামনে পাঠা বলি দেওয়া হতো। বছরে দুই দিন মেলা হতো। এখন মেলা বন্ধ রয়েছে। তবে প্রতিবছর বুড়োমার পূজা হয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর যতবার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে, ততবার নির্বাচিত চেয়ারম্যানরা ওই স্থানে মাটি ভরাট করেছেন। কিন্তু মাটি ধরে রাখা যায়নি। আমার ধারণা, অলৌকিক কিছু না থাকলে এত মাটি কোথায় যাবে! তাই আমরা গ্রামবাসী ভেবেছি, দেবে যাওয়া স্থানে গ্রামবাসী সবাই মিলে পূজা করে দেবী বুড়োমার কাছে ক্ষমা চাইব।’

এ ব্যাপারে মাহমুদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদ রানা বলেন, ‘স্থানটি অনেকবার মেরামত করা হয়েছে; কিন্তু মাটি থাকে না। পাইলিং করার সময় রক্ত বের হচ্ছে, এমন সংবাদ পেয়ে আমিও সেখানে যাই। সেখানে গিয়ে প্রায় ১০০ ফুট এলাকাজুড়ে লাল ও গোলাপি রঙের পানি দেখতে পাই। আমি বাস্তববাদী একজন মানুষ। তার পরও এ ঘটনা দেখে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি এখানে অলৌকিক কিছু আছে।’

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাশিয়ানীর উপসহকারী প্রকৌশলী আবু সিদ্দিক খন্দকার বলেন, ‘আমরা রাস্তা নির্মাণের কাজ করতে গেলে ওই স্থানে মাটি বারবার দেবে যাচ্ছিল। পরে পাইলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে আমরা জানতে পারি, ওই স্থান দিয়ে লালচে পানি বের হচ্ছে। এ খবরে এলাকাবাসী সেখানে ভিড় করে। তারা এখন সেখানে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে পূজা-অর্চনা করছে। আমাদের ধারণা, চোরাবালির কারণে এ সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে আপাতত কাজ বন্ধ রয়েছে। বিশেষজ্ঞ কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং টিম স্থানটি পর্যবেক্ষণ করে যে সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা পরবর্তী সময়ে সেভাবেই কাজ করব।’

Leave a Reply